বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন

কেরানি বাবার মেয়ে হলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘পটাতে পটু’ নাহিদার লেনদেন দেখে বিস্মিত দুদক

কেরানি বাবার মেয়ে হলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘পটাতে পটু’ নাহিদার লেনদেন দেখে বিস্মিত দুদক

চট্টগ্রামের খুলশী থানার পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকার জাকির হোসেন বাইলেন স্থায়ী ঠিকানার বাসিন্দা নাহিদা রুনাই। তাদের বাড়িটি স্থানীয়ভাবে মোজাফ্ফর খানের বাড়ি হিসেবে পরিচিত। রুনাইয়ের বাবার নাম মফিজুর রহমান। তিনি চট্টগ্রামে একটি স’রকারি দফতরে ‘কেরানি’ পদে চাকরি করতেন। রুনাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় এসে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিডেটে চাকরি পান। সেখানেই ২০০৯ সাল থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন পি কে হালদার।

২০১১-১২ সালে পি কে হালদারের সঙ্গে পরিচয় হয় রুনাইয়ের। এরপর ঘনিষ্ঠতা। তারপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শনৈ শনৈ উন্নতি হয় রুনাইয়ের। এসএমই লোন শাখার অফিস এক্সিকিউটিভ থেকে প্রতিষ্ঠান প্রধান পি কে হালদারের বান্ধবী ‘বড় আপা’ হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি পদে যোগ দেন পি কে হালদার। পি কে হালদার রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে নাহিদা রুনাইকে নিয়ে আসেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে। দ্রুত সময়ে তাকে চারটি পদোন্নতি দিয়ে ভাইস প্রে’সিডেন্ট করেন পি কে হালদার।

দু’র্নীতি দ’মন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তারা বলছেন, পি কে হালদারের টাকা পা’চারের অন্যতম সহযোগী এই নাহিদা রুনাই। কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কত টাকা আ’ত্মসাৎ ও পা’চার হচ্ছে সেই হিসাব রাখতেন রুনাই। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন মহলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘পটাতে পটু’ রুনাইয়ের দক্ষ’তা অপরিসীম। তিনি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করতে সিদ্ধহস্ত।

নাহিদা রুনাইয়ের একাউন্টে গত চার-পাঁচ বছরে ৭০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়েছে। এছাড়া রুনাইয়ের কমপক্ষে ২৮ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। আর এতেই বিস্মিত হয়েছে দুদক। কেননা একটি স’রকারি দফতরে ‘কেরানি পদ’-এ চাকরি করা বাবার অফিস এক্সিকিউটিভ মেয়ের পক্ষে বৈধভাবে অর্জন অসম্ভব বলেই মনে করছেন ত’দন্ত সংশ্লিষ্টরা।

নাহিদা রুনাই বর্তমানে নিয়মিত অফিস করছেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে। পি কে হালদারের কমপক্ষে চারটি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। পি কে হালদারের বি’রুদ্ধে বিপুল অঙ্কের অর্থ আ’ত্মসাৎ ও পা’চারের অ’ভিযোগ ত’দন্তকারী দুদক দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। পি কে হালদারের অর্থ আ’ত্মসাৎ ও পা’চারের বি’ষয়ে অনুসন্ধান ও ত’দন্ত করছে দুদকের উপ-পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বে চার সদস্যদের একটি দল।

দুদকের অনুসন্ধান দলের একজন কর্মকর্তা বলেন, পি কের দ’খলে থাকা ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটিজের ১০০ কোটি টাকা নিজের মতো করে খরচ করার সুযোগ পান রুনাই। এ ছাড়া পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিতে (বিআইএফসি) রুনাইয়ের দাপট ছিল।

দুদকের মা’মলায় আ’দালতে দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জ’বানব’ন্দি দেন পি কের অন্যতম সহযোগী পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর হাকিম আতিকুল ইসলামের কাছে দেওয়া ওই জ’বানব’ন্দিতে নাহিদা রুনাই ও অবন্তিকা বড়ালের বি’ষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন উজ্জ্বল কুমার নন্দী।

জ’বানব’ন্দিতে রুনাইকে ‘বড় আপা’ উল্লেখ করে উজ্জ্বল বলেন, পি কে হালদারের দুই বান্ধবী অবন্তিকা বড়াল ও নাহিদা রুনাই। এই দুজনের সঙ্গে তিনি পৃথকভাবে ২০ থেকে ২৫ বার সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেছেন। পি কে হালদারের সঙ্গ পাওয়া নিয়ে ওই দুজনের মধ্যে চলত ব্যাপক প্রতিযোগিতা। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে রুনাই ও অবন্তিকার সঙ্গে পি কে হালদারকে আলাদাভাবে সময় কা’টাতে দেখা যায়।

জ’বানব’ন্দিতে উজ্জ্বল কুমার নন্দী আরো বলেন, আমরা রুনাইকে বড় আপা আর অবন্তিকাকে ছোট আপা ডাকতাম। কারণ রুনাই চালাত ইন্টারন্যাশনাল লিজিং আর অবন্তিকা চালাত পিপলস লিজিং। পি কে হালদার বিভিন্ন সময় আমাকে বিভিন্ন দেশে প্রমোদ ভ্রমণে পাঠাতেন। তার সঙ্গে তিনবার মালয়েশিয়ায় গিয়েছি। আমার সঙ্গে অমিতাভ অধিকারী, রাজীব সোমও মালয়েশিয়ায় যান। একবার যাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। প্রতিবারই ভ্রমণের সব খরচ দিয়েছেন পি কে হালদার। তার টাকায় আমি সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে গিয়েছি তিনবার। এসব ভ্রমণে আমার সঙ্গী হতো রাজীব সোম, অমিতাভ অধিকারী এবং পি কের বান্ধবী অবন্তিকা বড়াল।

সিমটেক্সের সিদ্দিকুর রহমান, জেডএ অ্যাপারেলসের জাহাঙ্গীর আলম এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক শহীদ রেজা পি কে হালদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু উল্লেখ করে উজ্জ্বল জ’বানব’ন্দিতে বলেন, এদের বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে উপকৃত হয়েছেন পি কে হালদার। দুই ডজন অস্তিত্বহীন কাগুজে প্রতিষ্ঠান বানিয়ে আত্মীয়স্বজন ও সহযোগীদের ব্যবহার করে পি কে হালদার পিপলস লিজিং, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্স থেকে ঋ’ণ নিয়ে আ’ত্মসাৎ করে বিদেশে পা’চার করেছেন।

আপনার বন্ধুদের সাথে এই পোস্ট টি শেয়ার করুন

Comments are closed.

সাম্প্রতিক মন্তব্য

    © All rights reserved © 2018 banglaekattor.com