বুধবার, ১২ মে ২০২১, ০৮:৩৫ পূর্বাহ্ন

অন্যের জমিতে থাকেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্লাহ, ছেলে চালায় রিকশা

অন্যের জমিতে থাকেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্লাহ, ছেলে চালায় রিকশা

স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্লাহ থাকেন অন্যের জায়গায়। চলেন ধার-দেনা করে। সরকারি সম্মানীর টাকায় জোড়াতালি দিয়ে চলছে সংসার। তার চিকিৎসা খরচ ও পরিবারের চাহিদা মেটাতে একমাত্র ছেলেকে রিকশা চালাতে হয়। তিন যুগ আগে সরকারিভাবে জমি দেয়া হলেও তা এখন প্রভাবশালীদের দখলে। তাই নিজের বসতভিটা না থাকায় পরের জমিতে টিনশেড ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার উপজেলার রামনগর গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্লাহ। ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করেন। গানের প্রতি ছিল তার অনেক টান। সেই সময় সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করতেন। তিনি গানকে যেমন ভালোবাসতেন তেমন ভালোবাসতেন জন্মভূমিকে।

জন্মভূমির প্রতি এই টান থেকেই ১৯৭১ সালে দেশ রক্ষার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। তবে দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো নিজস্ব বসতবাড়ি জোটেনি এই বীর মুক্তিযোদ্ধার। সংসারে অভাব-অনটনের কারণে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারেননি। তাই তাদের কপালেও জোটেনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরি।

মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করি। মনে আশা ছিল চাকরি করব। কিন্তু সেসময় দেশের পেক্ষাপটে চাকরির সুযোগ পাওয়ার আগেই শুরু হয় যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পরে পাকহানাদার বাহিনী আমার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে আমার এসএসসি পাসের সনদসহ যাবতীয় কাগজ নিয়ে যায়।

এজন্য দেশ স্বাধীনের পরেও আমি আর চাকরির সুজোগ পাইনি। স্বাধীনতার পরে ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের শাসনামলে সরকারিভাবে ভাঙ্গালী নদীর চরে আমাকে সরকারি ৬ বিঘা জমি দেয়া হয়। কিন্তু সেই জমির ওপর ছিল শকুনের চোখ। আমাকে ও আমার পরিবারকে হত্যার হুমকি দিয়ে সেই জমি এখনো প্রভাবশালীদের দখলে।’

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় প্রভারশালীরা জোর করে জমি লিখে নিয়েছে আবার অনেকেই এই জমি জোরপূর্বক এখনো দখল করে রেখেছে। নিরূপায় হয়ে শ্বশুরবাড়ি এলাকায় এসে পরের জায়গায় একটি টিনশেড বাড়ি করেছি। সংসার চলছে টেনেটুনে। পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের কেউ সরকারি চাকরি পায়নি। ফলে একমাত্র ছেলেকে রিকশা-ভ্যান চালিয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে।’

মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্লাহর স্ত্রী আকিসা বেগম বলেন, ‘সরকারের কাছে আমার চাওয়ার কিছু নেই। তবে সরকারিভাবে যদি ঘরের ব্যবস্থা করে দিতো তাহলে আমরা সুখে-শান্তিতে বাঁচতে পারতাম।’

রহমত উল্লাহর ছেলে মো বাবলু ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারিভাবে দেয়া বাবাকে জমি রক্ষা করতে গিয়ে আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে। আমরা বাধ্য হয়ে সেই জমি ছেড়ে দিয়ে এখন অন্যের জমিতে মানবেতর জীবনযাপন করছি।’

তিনি বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধার ছেলে হয়ে রিকশা চালাতে গিয়ে কখনো মুক্তিযোদ্ধা বাবার পরিচয় দেই না। বাবার চিকিৎসা খরচসহ সংসার চালাতে মাকে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয়। আমরা চাই সরকার আমাদের দিকে সুদৃষ্টি দিক।’

সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য (মেম্বার) মো হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্লাহর জন্য যদি সরকারিভাবে ঘর দেয়া হতো তাহলে তার পরিবের দুঃখ-কষ্ট লাঘব হতো। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি যেন মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্লার পাশে সরকার থাকে।’

গাইবান্ধা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড সংসদের ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌতম চন্দ্র মোদক বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের যে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্যার পরিবারকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য জেলা মুক্তিযোদ্ধা কামান্ড সবসময় পাশে থাকবে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো আব্দুল মতিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারিভাবে বসতবাড়ি দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ইউএনও বরাবর আবেদন করলে হলে ওনাকে অবশ্যই বসতবাড়ি দেয়া হবে।’

আপনার বন্ধুদের সাথে এই পোস্ট টি শেয়ার করুন

Comments are closed.

সাম্প্রতিক মন্তব্য

    © All rights reserved © 2018 banglaekattor.com