টিপু হত্যার নীল নকশা, কিলার মাসুমকে ভাড়া করেছিল কারা? - বাংলা একাত্তর টিপু হত্যার নীল নকশা, কিলার মাসুমকে ভাড়া করেছিল কারা? - বাংলা একাত্তর

মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২, ০৬:২৯ পূর্বাহ্ন

টিপু হত্যার নীল নকশা, কিলার মাসুমকে ভাড়া করেছিল কারা?

টিপু হত্যার নীল নকশা, কিলার মাসুমকে ভাড়া করেছিল কারা?

মতিঝিল আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুর রহমান টিপু ও কলেজ শিক্ষার্থী সামিয়া আফরান প্রীতি হ’’ত্যার শুটার মাসুম মো. ওরফে আকাশকে গ্রে’প্তার করার পরও এই হ’’ত্যাকাণ্ডের র’হস্য উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি মহানগর গো’য়েন্দা পুলিশ (ডি’বি)।

সিসি ক্যামেরা ফুটেজ, নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও কি’লারের স্বী’কারোক্তি অনুযায়ী ডি’বি নিশ্চিত হয় মাসুমই সেই কি’লার। গতকাল বগুড়া জে’লা থেকে গ্রে’প্তারের পর ডি’বি কর্মকর্তা দফায় দফায় তাকে জি’জ্ঞাসাবাদ করেছেন। কিন্তু পেশাদার এই খু’নি অগোছালো সব তথ্য দিচ্ছে।

দীর্ঘ সময় জি’জ্ঞাসাবাদে কেন এই হ’’ত্যাকাণ্ড, কার কাছ থেকে কিলিং কন্ট্রাক্ট পেয়েছে, এর পেছনে কারা কারা জ’ড়িত ঠিকঠাক কোনো তথ্য দেয়নি মাসুম। তবে তার কাছ থেকে পাওয়া কিছু নামের ব্যক্তিদের গ্রে’প্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে ডি’বি। তার সঙ্গে ওই ব্যক্তিদের মুখোমুখি করালে অনেক সত্য বের হয়ে আসবে বলে ধারণা করছে ডি’বি। ত’দন্তে পাওয়া আরও কিছু তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

এই শুটারকে রি’মান্ডে এনে আরও বিস্তর জি’জ্ঞাসাবাদ করলে বেশকিছু প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করছে ডি’বি কর্মকর্তারা। এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে জ’ড়িত থাকতে পারে এমন বেশ কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

কি’লার মাসুম মোহাম্ম’দপুর এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে গ্রাফিক্স ডিজাইনের ও’পর পড়াশোনা করেছে। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলবের কাইশকানি। ঢাকার পশ্চিম মাদারটেক এলাকায় থাকতো। তার বাবা একজন স্কুল শিক্ষক। তার স্ত্রী ও এক স’ন্তান আছে। নে’শার জগতে যুক্ত না থাকলেও অ’পরাধ জগতে মাসুম বেশ পাকাপোক্ত। বিভিন্ন অ’পরাধে অনেক মা’মলা তার মাথার উপরে। অ’পরাধজগতে জড়িয়ে একটি হ’’ত্যা মা’মলাসহ চার-পাঁচটি মা’মলার ফেরারি আ’সামি।

ডি’বি পুলিশকে মাসুম জানিয়েছে, মূলত বিভিন্ন মা’মলার জন্য সে শান্তিতে বাস করতে পারছিল না। সবসময় মা’নসিক একটা অশান্তির মধ্যে থাকতে হতো। তাই যেকোনোভাবে মাসুম চাইছিল এসব মা’মলা থেকে মুক্তি। তাই মা’মলা থেকে মুক্তি ও আরও কিছু সুযোগ-সুবিধার জন্য টিপুকে হ’’ত্যা করতে রাজি হয়। প্রাথমিকভাবে দু’জন ব্যক্তির কথা ত’দন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে জানিয়েছে মাসুম। তারা হলেন- মুসা ও শামীম। মুসা হচ্ছেন যুবলীগ নেতা রিজভী হাসান বাবু ওরফে বোচা বাবু হ’’ত্যাকাণ্ডের আ’সামি। আর শামীমের পরিচয় জানা যায়নি।

ডি’বির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, হ’’ত্যার পাঁচদিন আগে ২০শে মার্চ মাসুম জাহিদুল ইসলাম টিপুকে হ’’ত্যার কন্ট্রাক্ট পায়। আর তিনদিন আগে যাকে হ’’ত্যা করতে হবে তার নাম পরিচয় ও ছবি পায়। পরে কাট আউট সিস্টেমে কমলাপুরের ইনল্যান্ড ডিপো এলাকা থেকে মাসুম একটি মোটরসাইকেল ও হ’’ত্যার কাজে ব্যবহৃত পি’স্তল সংগ্রহ করেছে।

ঘটনার আগের দিন ২৩শে মার্চ জাহিদুল ইসলাম টিপুকে তার এজিবি কলোনির রেস্টুরেন্ট থেকে বাসায় যাওয়ার রাস্তায় অনুসরণ করে গু’লি করার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু বেশি লোকজন থাকায় সে ব্যর্থ হয়। ঘটনার দিন ২৪শে মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে একজন ফোন করে মাসুমকে জানায়, টিপু তার রেস্টুরেন্টে অবস্থান করছে। এ সংবাদ পেয়ে মাসুম রেস্টুরেন্টের কাছ থেকে টিপুকে অনুসরণ করা শুরু করে এবং গু’লি করার জন্য প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু টিপু অনেক লোকজনের মধ্যে থাকায় গু’লি করতে না পেরে টিপুর গাড়ি অনুসরণ করে। গাড়িটি শাহজাহানপুর রেল লাইনের আগে আমতলা সংলগ্ন রাস্তায় যানজটে আ’টকা পড়লে মাসুম গাড়ির চালকের পাশের আসনে বসা টিপুকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গু’লি করে পা’লিয়ে যায়।

ডি’বি প্রধান বলেন, ঘটনার পর দুই বন্ধুর সহযোগিতায় নিরাপদ স্থানে আত্মগো’পনে যায় শুটার মাসুম। পরে ফেসবুকের মাধ্যমে নিরপরাধ রিকশা আরোহী প্রীতি এবং টিপুর মৃ’ত্যুর সংবাদ দেখতে পায়। এরপর কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে জয়পুরহাট চলে যায়। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পার হতে না পেরে বগুড়ায় চলে আসে। যে গাড়িতে তিনি যাদেরকে নিয়ে জয়পুরহাটে গিয়েছিল, সেই গাড়ির লোকজন ঢাকায় আসার পর তাদের নিয়ে বগুড়ায় যায় পুলিশ। পরে বগুড়া জে’লা পুলিশের সহায়তায় মাসুমকে গ্রে’প্তার করা হয়।
প্রীতি হ’’ত্যা নিয়ে মাসুম ডি’বিকে জানিয়েছে, তার টার্গেট ছিল টিপুকে হ’’ত্যা করা। তাই সে অ’স্ত্রের ট্রিগার চে’পে ধরেছিল। একাধারে গু’লি বের হচ্ছিল। প্রীতিকে টার্গেট করে গু’লি করেনি। প্রীতির শরীরে যে গু’লি লেগেছে সেটা জানতো না। হ’’ত্যার পরের দিন টিভি দেখে জেনেছে।

ডি’বির ত’দন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পুরো কিলিং মিশনটি কাট আউট পদ্ধতিতে হয়েছে। এই হ’’ত্যাকাণ্ডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কানেকশন রয়েছে। বিদেশে পা’লিয়ে থাকা শীর্ষ স’ন্ত্রাসীরা জ’ড়িত আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাসুম জানিয়েছে, মুসা ও শামীম ছাড়া আর কাউকে সে চিনে না। কাট আউট পদ্ধতিতে অ’জ্ঞাতনামা ব্যক্তির কাছ থেকে অ’স্ত্র ও মোটরসাইকেল সংগ্রহ করেছে। আবার অ’জ্ঞাতনামা ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কেউ কারও নাম জানে না। হ’’ত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছে অটোমেটেড পি’স্তল। তাই মাত্র ২০ সেকেন্ডে এক চা’পেই ১২ রাউন্ড গু’লি বের হয়েছে। আগে থেকে পি’স্তল চা’লানোয় পারদর্শী ছিল মাসুম।

ডি’বি জানায়, মাসুমের দেয়া বিভ্রান্তিকর তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মেলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে আসলে এই হ’’ত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জ’ড়িত। কে তাকে এই কন্ট্রাক্ট দিয়েছে। কিসের বিনিময়ে কন্ট্রাক্টে রাজি হয়েছে। যদিও প্রাথমিকভাবে সে মুসা ও শামীমের নাম বলছে। অথচ জি’জ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে মুসার সঙ্গে তার মাত্র দুবার দেখা হয়েছে। এ ছাড়া মুসা নিজেও হ’’ত্যা মা’মলার আ’সামি। তার মা’মলার সুরাহা করতে পারছে না। কিন্তু মাসুম বলেছে, মুসা তাকে সমস্ত মা’মলা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দিবে এই কন্ট্রাক্টে কাজ করেছেন। ডি’বির মতে, যেখানে মুসা নিজেই তার মা’মলা নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করছে সেখানে মাসুমকে কীভাবে সহযোগিতা করবে। তাই এসব তথ্যর কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যদি মুসাকে গ্রে’প্তার করা যায় তবে এসব তথ্যর সত্যতা মিলবে।

ডি’বি বলছে, টিপু হ’’ত্যাকাণ্ডের চুক্তিতে টাকার লেনদেন হয়েছিল কিনা সেটি যাচাই করার জন্য মাসুম, তার স্ত্রী ও তার ঘনিষ্ঠজনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যাচাই করা হবে। লেনদেন হলে সেটি ঘটনার আগে পরে যেকোনো সময় হতে পারে। ত’দন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, ঘটনার পর থেকে এই হ’’ত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা সেটি বের করার জন্য মতিঝিল এলাকার একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি ও কয়েকজন কাউন্সিলরকে জি’জ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। টে’ন্ডারবাজি নিয়ে কোনো দ্ব’ন্দ্ব আছে কিনা সেজন্য এ ছাড়া ক্রীড়া ভবনের ঠিকাদারির সঙ্গে জ’ড়িত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহরিয়ার সোহেলসহ কয়েকজনকে জি’জ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিশ ব্যবসা নিয়ে কোনো ঝামেলা আছে কিনা সেজন্য ওই এলাকার ডিশ ব্যবসা যারা নিয়ন্ত্রণ করেন জাহাঙ্গীর, ফারুক ও হাসানকে জেরা করা হয়েছে।

ত’দন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে ২০১৬ সালে যুবলীগ নেতা রিজভী হাসান বাবু ওরফে বোচা বাবুকে হ’’ত্যা করা হয়। এই মা’মলার আ’সামি ছিলেন মুসা। বোচা বাবুর বাবা আবুল কালাম আজাদ নি’হত টিপুর ঘনিষ্ঠজন। তারা একসঙ্গেই থাকতেন। বোচা বাবু হ’’ত্যা মা’মলার সব খরচ বহন করতেন টিপুই। ঘটনার সময় গাড়ির পেছনে যে দু’জন বসা ছিলেন, তাদের একজন এই আবুল কালাম। বোচা বাবু হ’’ত্যাকাণ্ডের পর বেশ কয়েকজন আ’সামি গ্রে’প্তার হলেও জা’মিনে বেরিয়ে আসেন। আ’সামি সাগরের সঙ্গে আবুল কালামের মীমাংসা হয় টিপুর মধ্যস্থতায়। অন্য আ’সামি শুটার নেসার, মতিঝিল এলাকার সবচেয়ে দক্ষ শুটার হিসেবে পরিচিত সাব শুটার মুসা ও তার ভাই সালেহ মীমাংসার জন্য টিপুর দারস্থ হন। কিন্তু টিপু তাদের আবদার না শোনায় তারা সবাই মনঃক্ষুণ্ন হন। নেসার, মুসা ও তার ভাই সালেহ আন্ডারওয়ার্ল্ডের জিসান এবং বিকাশ ও তার ভাই প্রকাশের অনুসারী। বাবু হ’’ত্যা মা’মলার মীমাংসা না পেয়ে এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন ওই শুটারদের কেউ।

২০১৩ সালের ২৯শে জুলাই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তৎকালীন দক্ষিণ যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কি হ’’ত্যার এজাহারনামীয় আ’সামি ছিলেন টিপু। মা’মলা থেকে অব্যাহতি পেলেও মিল্কির শুভাকাঙ্ক্ষীরা ওই হ’’ত্যার প্র’তিশোধ নিতে অথবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ আন্ডারওয়ার্ল্ডের ওই তিন গডফাদারের মাধ্যমে টিপুকে হ’’ত্যা করাতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, যুবলীগ দক্ষিণের সাবেক নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার ঘনিষ্ঠ ছিলেন টিপু।

ক্যা’সিনোকাণ্ডে ওই দুই নেতা জে’লহাজতে গেলে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে আসে টিপুর কাছে। বেশ কয়েক বছর ধরে টিপু এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন। এসব থেকে তার ও’পর ক্ষি’প্ত ছিলেন সুবিধা প্রত্যাশী অন্যরা। মতিঝিল এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কারও ক্ষো’ভের বলি হতে পারেন টিপু।

আপনার বন্ধুদের সাথে এই পোস্ট টি শেয়ার করুন

Comments are closed.

সাম্প্রতিক মন্তব্য

    © All rights reserved © 2018 banglaekattor.com