মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ০৪:৪৩ পূর্বাহ্ন

বেকার নূপুর থাকেন লাখ টাকা ভাড়ার ফ্ল্যাটে

বেকার নূপুর থাকেন লাখ টাকা ভাড়ার ফ্ল্যাটে

তেজগাঁওয়ের গ্রামীণফোনের সার্ভিস সেন্টারে কর্ম’রত এক কর্মীর সহযোগিতায় সার্ভা’র থেকে গ্রাহকের তথ্য চু’রি করে তাদের ব্ল্যাকমেইল করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জ’ড়িত একটি চক্রের চার সদস্য গ্রে’ফতার করেছে ঢাকা মহানগর পু’লিশের হাতিরঝিল থা’না পু’লিশ। ওই চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন পারভীন আক্তার নূপুর নামে এক নারী।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, দৃশ্যমান কোনও পেশা না থাকলেও সপ্তম শ্রেণি পাস নূপুর থাকেন গুলশানের নিকেতনে। তার ফ্ল্যাট ভাড়া মাসে লাখ টাকা।তার মে’য়ের স্কুলের বেতন প্রতিমাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা। সে বনানীর ১১ নং রোডের ই-ব্লকের গ্রিন ডিলাক্স হাউজ নামের একটি জিমে নিয়মিত যায়। সেখানে প্রতিমাসে ৩০ হাজার টাকা বিল দেয়। গুলশান থা’নায় সে একবার অ’ভিযোগ করেছিল যে, তার ৬টি লিপস্টিক চু’রি হয়েছে, যে ৬টি লিপস্টিকের দাম ৯০ হাজার টাকা।

এ বিষয়ে বুধবার (৯ ডিসেম্বর) তেজগাঁও বিভাগের উপ-পু’লিশ কমিশনার মোহাম্ম’দ হারুন অর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছে পারভীন আক্তার নূপুর। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে টার্গেট করে প্রে’মের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে। তার টার্গেট ছিল মূল ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিরা। টার্গেট করা ব্যক্তির সব ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে পরিবারের সব সদস্যকে জানিয়ে দেওয়ার হু’মকি দিয়ে পাঁচ লাখ থেকে শুরু করে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে।’

জানা গেছে, এমনকি ভু’য়া আইনজীবীর মাধ্যমে ফোন করে নারী নি’র্যাতন এবং ধ’র্ষণ মা’মলার হু’মকি দিয়ে ভ’য় দেখানো হয়। এই চক্রকে টার্গেট করা ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করে গ্রামীণফোনের সার্ভিস সেন্টারের কর্মী রুবেল মাহমুদ অনিক। চক্রের প্রধান পারভীন আক্তার নূপুর, তার বোন শেফা’লি বেগম, গ্রামীণফোনের কর্মী রুবেল মাহমুদ অনিক এবং নূপুরের সহযোগী শামসুদ্দোহা খান বাবু নামে ৪ জনকে গ্রে’ফতার করেছে পু’লিশ। এরপরই বেরিয়ে এসেছে এ ধরনের ভ’য়ঙ্কর প্রতারণার নানা তথ্য।

প্রতারক পক্রের চার সদস্য

গত বৃহস্পতিবার থেকে রবিবারের মধ্যে রাজধানীর মোহাম্ম’দপুর, হাতিরঝিল এবং বাড্ডা এলাকা থেকে তাদের গ্রে’ফতার করে হাতিরঝিল থা’না পু’লিশ। হাতিরঝিল থা’নায় দায়ের করা প্রতারণা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুই মা’মলায় তাদের গ্রে’ফতার দেখানো হয়েছে। আইনজীবী পরিচয়দানকারী ইসা নামে চক্রের এক সদস্য এখনও পলাতক।

৫/৬ সদস্যের এই সংঘবদ্ধ চক্রটি উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের টার্গেট করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ষাটোর্ধ্ব বয়সের লোকজনই তাদের মূল টার্গেট। চক্রের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার ২০-২৫ জনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।

যেভাবে ব্ল্যাকমেইল করা হয়

গ্রামীনফোনের সার্ভিস সেন্টারের কর্মী রুবেল মাহমুদ অনিক ও ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্ম’রত শামসুদ্দোহা খান বাবুর সঙ্গে নূপুরের সখ্যতা রয়েছে। অনিক ও বাবু নূপুরকে বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বর দিয়ে নূপুরকে সহযোগিতা করে। এরপর নূপুর নিজেকে কখনও সমাজকর্মী কখনও সুবিধাবঞ্চিত শি’শুদের জন্য তহবিল সংগ্রহকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। সুবিধাবঞ্চিত শি’শুদের জন্য তহবিল সংগ্রহে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে, চাকরির প্রার্থী বা সাংবাদিক পরিচয়ে এসব ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে। নানা অজুহাতে টার্গেট করা ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে। অনেক সময় ব্যক্তিগত স্প’র্শকাতর বা গো’পন কথা বলে তা মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে। এমনকি মোবাইল ফোনে প্রে’মের স’ম্পর্ক গড়ে তোলে নূপুর। বয়স্ক ব্যক্তিদের টার্গেট করে এমন প্রে’মের স’ম্পর্ক করে। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তির পরিবারকে সব জানিয়ে দেওয়ার ভ’য় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে।

অনিক

এদিকে এসব ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে নূপুরকে গ্রামীণফোন সার্ভিস সেন্টারে কর্ম’রত রুবেল তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করে। বিস্তারিত এসব তথ্য নিয়ে নূপুর ওইসব ব্যক্তিদের হু’মকি দিতে থাকে। নূপুরের চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে এমন হু’মকি অব্যাহত থাকে। এমনকি তার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে এমন কথা পরিবারের সদস্যদের জানানোর হু’মকি দেওয়া হয়। দাবি’কৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নূপুরের বড়বোন শেফা’লী টার্গেট করা ব্যক্তিকে ফোন করে মা’মলার হু’মকি দেয়। অনেকেই সম্মানের ভ’য়ে দাবি’কৃত টাকা দিয়ে দেন। তবে কেউ দাবি’কৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে ইসা নামে অ’পর এক সদস্য ওই ব্যক্তিদের ফোন করে মিথ্যা ও বানোয়াট ধ’র্ষণ মা’মলা বা নারী নি’র্যাতন মা’মলা করার হু’মকি দেয়। ইসা বিভিন্ন মিথ্যা ও বানোয়াট বিল ভাউচার তৈরি করার কথাও জানায়। এমনকি শারীরিক অ’সুস্থতার অজুহাতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী টার্গেট করা ব্যক্তিকে ফাঁ’সানোর জন্য নামকরা চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে প্রেসক্রিপশনে স্বামীর নাম অ’পশনে ওই ব্যক্তির (টার্গেট) নাম লিখে আনে নূপুর।

কয়েক মাসে পারভীন তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর এবং আরও কয়েকটি মোবাইল নম্বর থেকে ১৫-২০ জন ব্যক্তিকে টার্গেট করে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অংকের অর্থ আদায় করেছে। এমনকি রুবেলের মোবাইল নম্বরে এসএমএসের মাধ্যমে ৬টি গ্রামীণফোন নম্বর পাঠিয়ে মোবাইল নম্বরধারী ব্যক্তির সিম রেজিস্ট্রেশন তথ্য (নাম, পিতার নাম, ঠিকানা, জন্ম তারিখ, জন্ম নিবন্ধন নম্বর) জানতে চায় নূপুর। দশ হাজার টাকার বিনিময়ে রুবেল গ্রামীণফোন সার্ভা’র থেকে এ তথ্যগুলো সংগ্রহ করে হাতে লিখে নূপুরকে দেয়।

নূপুরের বোন শেফা’লী

প্রতারক চক্রের অন্যরা কী’ করে?

নূপুরের বোন শেফা’লী ক্লাস থ্রি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। সে চাঁদনী চক মা’র্কে’টে স্কার্ফ, হিজাব ও বোরকার ব্যবসা করে। শামসুদ্দোহা মতিঝিল দৈনিক বাংলা মোড়ে পারফেক্ট ট্রাভেল এজেন্সিতে ১৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে। অবিবাহিত শামসুদ্দোহা মোহাম্ম’দপুরে শেফা’লীর ফ্ল্যাটেই থাকে। রুবেল তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থা’নাধীন নাবিস্কো মোড়ে অবস্থিত গ্রামীণফোন সার্ভিস সেন্টারে কাজ করে। ইসা নিজেকে আইনজীবী ও একটি ল’ ফার্মে কাজ করে বলে পরিচয় দিয়েছে।

আপনার বন্ধুদের সাথে এই পোস্ট টি শেয়ার করুন

Comments are closed.

সাম্প্রতিক মন্তব্য

    © All rights reserved © 2018 banglaekattor.com