শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ০৮:১৮ অপরাহ্ন

দরজায় অবুঝ সন্তান, ভিতরে কাঁদছেন করোনায় আক্রান্ত চিকিৎসক মা

দরজায় অবুঝ সন্তান, ভিতরে কাঁদছেন করোনায় আক্রান্ত চিকিৎসক মা

শিশু বয়স কত হবে তিন-চার কিংবা সর্বোচ্চ পাঁচ। যার এই বয়সে মায়ের বুকে ঘুমানোর কথা। মায়ের স্নেহমাখা হাত থাকবে তার মা’থায়। এমনটাই স্বাভাবিক।কিন্তু একই বাড়িতে থেকেও আবদ্ধ নির্দিষ্ট একটি রুমে। প্রিয় সন্তান বার বার আম্মু বলে ডাকে। এক সময় ডাকে সাড়া দিলেও আরেক সময় সাড়া নেই, কারণ এতে সন্তানকে কাছে নিতে না পারার ক’ষ্ট আরও বাড়ে। এমন ঘটনাই ঘটছে

করো’না পজিটিভ প্রত্যেক পরিবারে। সম্প্রতি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতা’লের এক চিকিৎসকের একটি ফেসবুকে দেখা যায় একটি আবেগঘন পোস্ট।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯ সব কিছুতেই পাহাড়সম বাঁ’ধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবার, সমাজসহ দেশ-বিদেশে। বর্তমান সময়ে করো’না যোদ্ধারা পরিবার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনযাপন করছে। অনেকের প্রিয় মা, বাবা, স্ত্রী’,

সন্তানের সঙ্গে দেখা হয় না দিনের পর দিন। কথা হয় ফোনে, দেখা হয় দূর থেকে। মনের ভিতরে একটা অ’তৃপ্তি থেকেই

যায় প্রিয়জনের জন্য। তার পরও কিছু করার নেই। নইলে করো’নাভাই’রাস আ’ক্রান্ত করবে প্রিয়জনকে। বর্তমান সময়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা খুবই জরুরি। নিজ সন্তানই যখন পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত সেখানে অন্য পরিবারের কথাটি সহ’জেই অনুমেয়।

বিষয়টি সাধারণ মানুষ কম বুঝলেও চিকিৎসকরা সবচেয়ে ভালো জানেন। তাইতো ময়মনসিংহের এক নারী চিকিৎসক নিজের বুকে পাথর বেঁধে আছেন হোম কোয়ারেন্টিনে। কিন্তু তার শি’শুটি কোনোভাবেই মানতে পারছে না যে মা বাড়িতে

থাকার পরেও কেন তার কাছে আসছে না। কেন দরজা বন্ধ করে রেখেছে। তাই সে মায়ের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে বারবার। তাতেও দরজা না খোলায় লাথি দিয়ে দরজা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে অবুঝ শি’শুটি। এমন কয়েকটি ছবিসহ

ফেসবুকে ম’র্মস্প’র্শী পোস্ট দিয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতা’লের ইন্টার্ণ চিকিৎসক সুমন হুসাইন। সোমবার (২০শে এপ্রিল) রাতে তিনি তার নিজ ফেসবুক আইডি থেকে এই পোস্ট দেন।

হুবহু ফেসবুক পোস্টটি তুলে ধ’রা হলো:

মা অন্য ঘরে, ছে’লে বায়না ধরেছে মায়ের কাছে যাবে। মে’য়ে বায়না ধরেছে মায়ের সাথে রাতে শুবে। ওদের ডাক্তার মাকে খুব কমই পায় বাচ্চা দুটো। তবে, মা বাড়িতে আছে, অথচ মা ওদের সাথে থাকেনি-এমনটা হয়নি কখনো।

করোনা
দরজা ধাক্কায় ওরা, মাকে ডাকে।

ওদের ডাক্তার বাবা ওদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করে, ভেতর থেকে মা-ও। ওরা বুঝে না। ছে’লেটা দরজা ধাক্কা দ্যায়, লাথি দিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা করে। ভেতর মা কাঁদে, যে মা একজন ডাক্তার। কোভিড-১৯ পজিটিভ প্যাশেন্টের ট্রিটমেন্ট দিতে গিয়ে যিনি গতকাল রাত থেকেই কোয়ারান্টাইনে, সবার থেকে আলাদা থাকছেন।

চিত্রটা কল্পনা করুন। বেশ ক’ষ্ট দিচ্ছে না গল্প টা? দারুণ না গল্প টা?

এটা গল্প নয়, একটুও গল্প নাই এখানে। আমা’র অনেক কাছের এক ডাক্তার আপুর গল্প। গল্পটা সব ডাক্তার মা বাবার গল্প। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতা’লের গাইনী বিভাগের একটা ইউনিটের একটা প্যাশেন্টের কোভিড-১৯ পজিটিভ ধ’রা পড়েছে। প্রায় সব ডাক্তার, নার্সরাই তার কনটাক্টে এসেছে ডায়াগনোসড হওয়ার আগে। সো পরের গল্প বুঝতেই পারছেন?

সবার ডাক্তারের পিসিআর টেস্ট করতে দেওয়া হয়েছে। না হউক এমন। মিটফোর্ড আর বরিশাল মেডিকেলের পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়তো “করো’নাপুরী” হিসেবে যোগ হতে যাচ্ছে এ লিস্টে।

সৃষ্টিক’র্তা, এই নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোর সাথে এই যে মায়ের লুকোচু’রি-সহ্য করতে পারেন?গাইনীতে প্রায় সব ডাক্তার আপুর ই এক দুইটা ছোট্ট বাচ্চা আছে। ডিউটির সময় যখন এগুলো নিয়ে কথা হয়-সবাইকেই একটা কথা বলতে শুনেছি, আমি মা’রা যাই কোনো সমস্যা নাই, আমা’র বাচ্চাটার কি হবে? আমা’র বাচ্চাদের কি হবে?

সেদিন গাইনীতে কোভিড-১৯ সা’সপেক্টেড একটা প্যাশেন্ট Expire করে। সেদিন কয়েকজন আপু বাসায়ই যাননি, তাদের

একটা চিন্তা তখন- আমি ম’রে যাই, সমস্যা নাই, আমা’র বাচ্চাগুলোকে যদি আমা’র জন্য ইনফেক্টেড হতে হয়, তাহলে ম’রে গিয়েও নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না, আমি আজ বাসায় যাবো না।

এসব দেখে শুনে আমা’র প্রচণ্ড মন খা’রাপ হয়। আমি মনে মনে ভাবি, আমা’র তো ভালোই, আমা’র এসব কোনো চিন্তা নাই, আমি আ’ক্রান্ত হলে কিংবা ম’রে গেলে- আমা’র তো কোনো দুঃখই নাই।

আমা’র তো কোনো বাচ্চা কাচ্চা নাই। বউ ও নাই।ঈশ্বরকে মনে মনে বলি- আমারে না হয় নাই দেখলা, এদের ক’ষ্ট দেখে কেমনে সহ্য করো?

আপনার বন্ধুদের সাথে এই পোস্ট টি শেয়ার করুন

Comments are closed.

সাম্প্রতিক মন্তব্য

    © All rights reserved © 2018 banglaekattor.com