বাংলাদেশে তুর্কি ও ইরানি ধারাবাহিকের জনপ্রিয়তার নেপথ্যে

| আপডেট :  ৭ অক্টোবর ২০২১, ০৬:৪৪ অপরাহ্ণ | প্রকাশিত :  ৭ অক্টোবর ২০২১, ০৬:৪৪ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশি টিভি দর্শকদের মধ্যে তুর্কি ধারাবাহিক ‘সুলতান সুলেমান’ সাড়া ফেলেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এখন বাংলাদেশে বিদেশি সিনেমা ও টিভি ধারাবাহিকের বাংলায় ডাবিং করার হিড়িক পড়েছে। মানসম্মত প্রযোজনা এবং তারকা অভিনেতা অভিনেত্রীদের উপস্থিতির কারণে এগুলো দর্শকদের মন জয় করছে।

তুরস্কের ত্রয়োদশ শতাব্দীর ঘটনা অবলম্বনে ঐতিহাসিক নাটক ‘দিরিলিস: আরতুগ্রুল’, ষোড়শ শতাব্দীর অটোম্যান সাম্রাজ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ‘সুলতান সুলেমান’ এবং সামাজিক নাটক ‘বাহার’; এই প্রতিটি ধারাবাহিক বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এগুলোর কারণে বাংলাদেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলে এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দর্শকের সংখ্যা বাড়ছে।

এ ধরনের বিদেশি অনুষ্ঠানের ডাবিং ও প্রযোজনার কাজটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এগুলোতে নিজস্ব ছোঁয়া আনতে টিভি চ্যানেল ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে বড় অংকের অর্থ ও সময় বিনিয়োগ করতে হয়।
আমরা বেসরকারি টিভি চ্যানেল দীপ্ত টিভি, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি ও পেশাদার কণ্ঠদাতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন তুর্কি সিরিজগুলোকে ডাবিং করার পেছনের ভাবনার কথা এবং কীভাবে এতে থিয়েটার কর্মীরা নতুন কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।

জনপ্রিয় ধারাবাহিক সুলতান সুলেমান দিয়ে দীপ্ত টিভি ২০১৫ সালে তাদের যাত্রা শুরু করে। শুরু থেকেই চ্যানেলটি ‘ফেরিহা’, ‘বাহার’ এবং ‘ফাতমাগুল’সহ আরও কিছু জনপ্রিয় তুর্কি ধারাবাহিক বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য সম্প্রচার করেছে।
বিদেশি ধারাবাহিকের লাইসেন্স নেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে একটি সিরিজকে সম্পূর্ণ ডাবিং করতে কী কী ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং এতে কতটুকু সময় লাগে, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন দীপ্ত টিভির গবেষণা বিভাগের প্রধান সুবর্ণা পারভিন।

তিনি বলেন, ‘তুর্কি নাটকের লাইসেন্স কেনার জন্য আমরা এজেন্সির মাধ্যমে যোগাযোগ করি। তারপর তারা আমাদেরকে নাটকের তালিকা পাঠান। সেখান থেকে আমরা অভিনেতা-অভিনেত্রী ও ঘরানা বিবেচনা করে নাটক নির্বাচন করি। চূড়ান্ত বাছাইয়ের পর আমরা সেটিকে স্ক্রিপ্ট টিমের কাছে পাঠাই। অনুবাদের কাজটা তারাই করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটি নিরীক্ষণ করার জন্য আমাদের পাঁচটি দল আছে, যার মধ্যে আমাদের নিজস্ব ডাবিং দল ও সাউন্ড এডিটররা আছেন।’
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হয় না। চিত্রনাট্য অনুবাদ হতে এক সপ্তাহ লাগে এবং নাটকের একটি ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটের পর্ব ডাবিং করতে আরও সাত দিন প্রয়োজন হয়। স্ক্রিনে যাতে সব কিছু ঠিক থাকে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য প্রিভিউ ও সাউন্ড দলের কাজটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

দীপ্ত টিভির নিজস্ব প্রায় ১১টি স্টুডিও যেকোনো তুর্কি ধারাবাহিকের ৩০ থেকে ৫০টি পর্ব বাংলাদেশি দর্শকদের উপযোগী করতে পারে।
সুবর্ণা পারভিন আরও বলেন, ‘২০১৫ সালে সুলতান সুলেমান দুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প্রচারিত হতো। সেটাই ছিল সেসময় বাংলাদেশি চ্যানেলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা অনুষ্ঠান। এর টিআরপি রেটিং ছিল দুই। দুই বার সম্প্রচার হিসাবে ধরলে টিআরপি রেটিং ৩ হয়।’

এই ধারাবাহিকগুলোর বাংলাদেশে কেন এত জনপ্রিয়? উত্তরে সুবর্ণা বলেন, উঁচু বাজেটের প্রযোজনা এবং এগুলোর কাহিনীর আকর্ষণ।
সুবর্ণা আরও বলেন, ‘নারী দর্শকরা তুর্কি ধারাবাহিক বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু সুলতান সুলেমানে হুররাম আর সুলতানের ভালোবাসার কাহিনী নারী-পুরুষ সবার মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছিল। এছাড়াও, তুর্কি ধারাবাহিকগুলোর আকর্ষণীয় যন্ত্রসংগীতও দর্শকদের মনে দাগ কাটে।’

ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও বিদেশি সিনেমা ও ধারাবাহিক নাটক দেখা যায়। জনপ্রিয় বাংলাদেশি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে তাদের নিজেদের তৈরি করা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ডাবিং করা ইরানি সিনেমাও দেখা যায়।

চরকির কন্টেন্ট অফিসার আদর রহমান বলেন, ‘ইরানি সিনেমার লাইসেন্স কেনার জন্য আমরা একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করি, যারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমাদেরকে অনুষ্ঠানের তালিকা পাঠায়। আমরা এখানে দুটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখার চেষ্টা করি। প্রথমত, আমরা সাম্প্রতিক অনুষ্ঠান নির্বাচন করি, কারণ আমরা দর্শকদের অনেক পুরনো অনুষ্ঠান দেখাতে চাই না। দ্বিতীয়ত, আমরা খেয়াল রাখি অনুষ্ঠানটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে মানানসই কী না। এক্ষেত্রে প্রতিটি পর্বে সাসপেন্স থাকতে হবে, যাতে দর্শকরা পরের পর্ব দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন।’

চরকি তাদের অনুষ্ঠানগুলোর ডাবিং করার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে। তাদের একটি ক্রিয়েটিভ কিউরেশান দল আছে, যারা অনুবাদ নিরীক্ষণ করেন। তারা, এমন কী কণ্ঠদাতাদের অডিশনের সময়ও উপস্থিত থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, কোন কণ্ঠদাতা কোন চরিত্রের জন্য সেরা হবেন।

আদর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা এখন তিনটি ডাবিং সংস্থার সঙ্গে কাজ করছি, কিন্তু সবচেয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছি ধ্বনি চিত্রের সঙ্গে। একটি সিনেমা প্রযোজনা করতে আমাদের ২০ দিন থেকে ১ মাসের মতো লাগে, কারণ আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যাই।’

চরকি আরও জানায়, বাংলায় ডাবিং করা ইরানি সিনেমা ‘তপলি’ ও তুর্কি সিনেমা ‘ওয়ান্স আপন অ্যা টাইম ইন আনাতোলিয়া’ তুমুল দর্শক সাড়া পেয়েছে।

দীপ্ত টিভির অ্যাসিস্ট্যান্ট ভয়েস ডিরেক্টর ও ‘সুলতান সুলেমান’ ধারাবাহিকের ইব্রাহীম পাশার কণ্ঠদাতা মোহাম্মদ মোর্শেদ সিদ্দিক জানান কীভাবে ডাবিং করার জন্য কণ্ঠদাতাদের নাটকের চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে যেতে হয়।

মোর্শেদ বলেন, ‘বিদেশি অনুষ্ঠানের ডাবিং করা কঠিন, কারণ তাদের কথা বলা ও শব্দ উচ্চারণের ভঙ্গি আমাদের থেকে অনেকটাই আলাদা। শুধু তাদের বাক্যগুলো অনুবাদ করলেই আমাদের কাজ হয় না, এগুলোর মধ্যে আমাদের নিজস্ব বাংলাদেশি ধাঁচ যুক্ত করতে হয় এবং একই সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হয় যাতে বক্তব্যের মূল ভাবের পরিবর্তন না হয়। উচ্চারণ করার সময় শরীরী ভাষাও সেই চরিত্রের সঙ্গে মিলে যেতে হবে। এটা না করতে পারলে আপনি লাইনগুলো ঠিকমত বলতে পারবেন না।’

ইব্রাহীম পাশার চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার জন্য মোর্শেদ তার দৈনন্দিন জীবনেও পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি এই চরিত্রের জন্য তার কণ্ঠ গুরুগম্ভীর করতে নিয়মিত তালিম নিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘তুর্কি ধারাবাহিকগুলো শুধু বিনোদনই দিচ্ছে না, এটি একই সঙ্গে শিশুদের প্রমিত বাংলা শিখতে সাহায্য করছে। আমরা এমনভাবে কথাগুলো বলি, যাতে মনে হয় কবিতা আবৃত্তি করছি। টিভি ধারাবাহিকের ডাবিংয়ের কারণে বেসরকারি চ্যানেলের দর্শক বেড়েছে, যার ফলে স্থানীয় ধারাবাহিকগুলোর দর্শক বেড়েছে, টিভির দর্শক বাড়ছে।’

মোর্শেদ আরও জানান, যেকোনো প্রয়োজনে বাইরে গেলে অনেকেই এখন তার কণ্ঠ চিনে ফেলেন।

তিনি হেসে বলেন, ‘তারা আমাকে নাটকের ডায়লগ শোনাতে বলেন অথবা কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করেন, কেন আমি হাতিসের সঙ্গে প্রতারণা করে নিগার কুলফার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছি।’

ইব্রাহীম পাশার কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি এই জনপ্রিয় সিরিজের গুল আগা, নিকো, পুলক মোস্তফা পাশা, কিরাজ আগাসহ আরও অনেক চরিত্রের কণ্ঠ দিয়েছেন।

‘বাহার’ সিরিজের নায়িকা চরিত্রের কণ্ঠ দিয়েছেন সহকারী কণ্ঠ প্রযোজক মারিনা মিতু। তিনি এই জনপ্রিয় সিরিজে তার চরিত্র নিয়ে আলাপ করেন।

এই সিরিজের গল্পটি বাহারকে ঘিরে, যে সিঙ্গেল মাদার হিসেবে একটি নিষ্ঠুর সমাজে তার সন্তানদের বড় করার সংগ্রাম করছেন।

মিতু বলেন, ‘বাহারকে অনেক ধরনের জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সব সময় কঠিন পরিস্থিতিতে তাকে কাঁদতে হয়। আমি তার চরিত্রের গভীরে ঢুকে তার আবেগগুলোকে আমার অংশ করে ফেলতাম। এ কারণে কাজ শেষে আমিও ভারাক্রান্ত হতাম। তবে এই পরিশ্রম বিফলে যায়নি, কারণ দর্শকরা প্রকৃতপক্ষে আমার চরিত্রটির প্রশংসা করেছেন।’

তিনি আরও জানান, ভক্তরা শুনে প্রায়ই অবাক হয় যে তিনি একই সঙ্গে ফাতমাগুলের নেতিবাচক চরিত্র মুকাদ্দাস ও বাহারের মতো সহজ সরল চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছে।

দীপ্ত টিভি ও চরকি ছাড়া বাংলাদেশের অন্যান্য ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, যেমন বিঞ্জ ও বঙ্গ বিডিও বাংলায় ডাবিং করা তুর্কি সিরিজ ও সিনেমা নিয়ে এসেছে।

অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান