সেবা না দিয়ে রুমে বসে মোবাইলে গেম খেলেন নার্স, হাসপাতালে দুই শিশুর মৃত্যু

| আপডেট :  ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:১২ অপরাহ্ণ | প্রকাশিত :  ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:১২ অপরাহ্ণ

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে নার্সদের অবহেলায় চিকিৎসা না পেয়ে দুই শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে দুই শিশুর স্বজনসহ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুর অভিভাবকদের রোষানলে পড়েছেন নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সোমবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে।

খবর পেয়ে সাংবাদিকরা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গেলে স্বজন ও অন্যান্য শিশুর অভিভাবকরা নার্সদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন। তারা অভিযুক্ত নার্সদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। মৃত দুই শিশু হলো জেলা শহরের কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড এলাকার ছয়ানিপাড়ার দিলীপ চন্দ্র রায়ের মেয়ে এবং রাজীবপুর উপজেলার মরিচাকান্দি গ্রামের রবিউল ইসলামের মেয়ে। দুই শিশু শনিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জন্মগ্রহণ করে।

মৃত এক শিশুর বাবা দিলীপ চন্দ্র রায় জানান, শনিবার হাসপাতালে তার স্ত্রী অঞ্জনা এক মেয়েসন্তানের জন্ম দেন। স্বাভাবিক প্রসব হলেও জন্মের সময় মাথায় আঘাত পেয়েছে জানিয়ে শিশুকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন চিকিৎসক। এরপর তাকে ইনজেকশন ও স্যালাইন দেওয়ার ব্যবস্থাপত্র দেন দায়িত্বরত চিকিৎসক।

দিলীপ রায় বলেন, ‘ওষুধ আর স্যালাইন নিয়ে এসে নার্সদের দিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার অনুরোধ করলেও শোনেননি। তারা রুমে বসে মোবাইলে গেম খেলেন, ফেসবুক চালান। এখনও স্যালাইন (অব্যবহৃত) পড়ে আছে। দুপুরে শিশুর অক্সিজেনের মাস্ক খুলে গেলে ঠিক করার জন্য নার্সদের ডাকি। তারা ধমক দিয়ে ফিরিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর শিশুটি মারা যায়।’ নিজের সন্তানের মৃত্যুর জন্য নার্সদের অবহেলাকে দায়ী করেন এই বাবা।

অপর মৃত শিশুর বাবা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘শিশুকে চিকিৎসা, ওষুধ দিতে ডাকলে নার্সরা আসেননি। চিকিৎসার অভাবে কখন শিশুটি মারা গেছে টেরও পাননি নার্সরা। তারা মোবাইলে গেম নিয়ে ব্যস্ত। রোগীর সেবা করতে তাদের অনীহা।’ রবিউলের বাবা (মৃত শিশুর দাদা) ফুল মিয়া বলেন, ‘শিশুটি মারা যাওয়ার পর নার্সরা আমাদের বলেন রংপুর নিয়ে যান। তারা আমার নাতনিতে হত্যা করেছে।’

ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুর অভিভাবকদের অভিযোগ, নার্সরা ডিউটি রুমে মোবাইলে গেম খেলেন। তারা ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকেন। কোনও সমস্যার কথা বললে অভিভাবকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে চিকিৎসা না দেওয়ার হুমকি দেন। শিশু ওয়ার্ডে বিকাল শিফটে দায়িত্বরত নার্স তুলশি রানী ও উর্মিলা শাহা এসব অভিযোগের বিষয়ে অবগত নন বলে জানান। তারা জানান, ঘটনার সময় যারা ডিউটিতে ছিলেন, ডিউটি শেষে চলে গেছেন তারা।

নার্সদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ কাকলী বেগম বলেন, ‘যে শিশু দুটি মারা গেছে তাদের অবস্থা খারাপ ছিল। এরপরও নার্সদের অবহেলা থাকলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ‘শিশু ওয়ার্ডে ৪৮ রোগীর বিপরীতে ভর্তি আছে ১১৮ শিশু। নার্স সংকট থাকায় রোগীর সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয়। ফলে ডিউটিতে ভুল-ত্রুটি হতে পারে’ যোগ করেন তিনি।

ডিউটি নার্সদের বিরুদ্ধে মোবাইল ফোনে গেম খেলা ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে খারাপ আচরণের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ড ইনচার্জ বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। দায়িত্বরত অবস্থায় রোগীর সেবা না দিয়ে মোবাইলে গেম খেলার অভিযোগ সত্যিই অমানবিক। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমরা এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেবো। প্রয়োজনে ডিউটিরত অবস্থায় অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধের সুপারিশ করবো।’

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ লিংকন বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানার পর শিশু ওয়ার্ডে গেছি। শিশু দুটির শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। শিশু দুটিকে রংপুরে নিয়ে যাওয়ার জন্য অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।’

নার্সদের বিরুদ্ধে চিকিৎসা অবহেলা ও মোবাইলে গেম খেলার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রোগীর স্বজনরা বিষয়টি আমাকেও বলেছেন। প্রয়োজনে আমি তদন্ত কমিটি করে দেবো। সেবা দিতে গিয়ে যদি তারা রোগীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন, সেটি কাম্য নয়। দায়িত্বে অবহেলা করলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন